প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর ৫

প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর ৪

কেবিনে ফিরে এলো নির্জন। ট্রেন থেমেছে জয়দেবপুর স্টেশনে। রুপা বলল, “আপনি কোথায় শোবেন? উপরে না নিচে?”

“উপরে! আমি সবসময় উপরে থাকতেই পছন্দ করি!”

হাসল রুপা, ইঙ্গিতটা ধরল পারল কিনা কে জানে! বলল, “দরজাটা লাগিয়ে দিন তো! বোরখা পরে থাকতে ইচ্ছে করছে না আর। আমার অভ্যাস নেই একদম!”

“তুমি বরং চেঞ্জ করে নাও, আমি বাইরে অপেক্ষা করছি”, বলল নির্জন ভদ্রতা করে।

“দরকার নেই। শুধু বোরখাটা খুলব। আপনি কি মনে করেছেন, আমি এই শীতে বোরখার নিচে কিছু পরিনি?”

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল নির্জন। ও ভাবেনি এভাবে। ঠিক তখনই দরজায় টোকা মারল কেউ। রুপা তাকাল নির্জনের চোখে। ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল কিছু।

একটু সময় নিয়ে, রুপাকে ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে চুপ থাকর নির্দেশ দিয়ে দরজা খুলল নির্জন।

“সরি, আপনাদের ডিস্টার্ব করলাম এই অসময়ে!”

দরজার ওপাশে তাহমিনা হায়াত! জ্যাকেটের উপর কম্বল জড়িয়ে এসেছেন একটা।

স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল নির্জন। গলার স্বরটা স্বাভাবিকের চেয়ে মোটা করে, ভারি গলায় বলল, “সমোসসা নাই! কিছু কইবেন?”

যথাসম্ভব পুরান ঢাকার টান গলায় আনতে চেষ্টা করল ও। নাকটা সামান্য কুঁচকে গেল তাহমিনার। আঞ্চলিকের কারণে?

“আপনাদের কাছে কি নাইফ আছে? আই মিন, ছুরি? ফল কাটার ছুরি?”, বললেন তাহমিনা হায়াত।

মাথা নাড়ল নির্জন। বলল, “না নাই! ট্রেনে কেউ ছুরিটুরি লইয়া আহে? আপনি এটেনডেনরে কইয়া দেখবার পারেন। হেরা হয়তো দিবার পারে!”

“অহহ বুঝতে পেরেছি। আচ্ছা, গুড নাইট!”

তাহমিনা হায়াত দাঁড়ালেন না আর, সম্পুর্ণ ইউটার্ন নিয়ে মন্থরগতিতে ফিরে চললেন নিজের কেবিনে।

দরজায় দাঁড়িয়ে তার কোমর আর পাছার অপূর্ব মেলবন্ধন দেখতে লাগল নির্জন তিনি কেবিনে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়া পর্যন্ত।

“কী সুন্দরী!”, অস্ফুটে বলে উঠল রুপা! “এত সুন্দরী হয় কীকরে কেউ!”

দরজা থেকে মুখ ফেরাল নির্জন। বলল, “শুধু সুন্দরী নয়, সেক্সিও!”

“হ্যাঁ। আপনি তো হাঁ করে তাকিয়ে ছিলেন।“, বোরখা খুলতে খুলতে বলল রুপা।

দরজাটা লাগিয়ে দিল নির্জন। “এত সুন্দরী মহিলার দিকে না তাকানোটা পাপ, জানো? আমরা ছেলেরা এডমায়ার না করলে, নারীদের সৌন্দর্যের মূল্য থাকে?”

“আপনার ঢাকাইয়া গলা কিন্তু জোস! আমি পর্যন্ত কনভিন্সড হয়ে গেছিলাম যে আমি পুরান ঢাকার!”

কিছু না বলে দরজা থেকে স’রে দাঁড়াল নির্জন।

“উনি খুব রুপসচেতন, তাই না? চুল বাঁধার ধরণটা দেখেছেন? স্যাভেন্টিজে ববিতা এভাবে চুল বাঁধতেন!”, উদ্দীপ্ত গলায় বলল রুপা।

“আর যাই দেখি, চুল অন্তত দেখিনি! অতোটা সভ্য আমার চোখ নয়!”

হিহি শব্দ হেসে উঠল রুপা। নির্জনের মনে হলো, পাখি ডেকে উঠল দূরে কোথাও!

সেফটিপিন আলগা করে হিজাব খুলল রুপা। ওর পরিচিত ম্যাডনা মুখ উদ্ভাসিত হলো নির্জনের সামনে। ওর মুখে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে নির্জন বলল, “তবে মিসেস জুলফিকারকে তোমার কাছে হার মানতে হবে। তোমার কাছে উনি কিছুই না!”

চমকে নির্জনের দিকে তাকাল রুপা। সলজ্জ হাসে বলল, “যাহ্‌! কী যা তা বলছেন। উনি তো একদম শোবিজ কাঁপানো নায়িকার মতো দেখতে!”

নির্জন তার ব্যাকপ্যাক খুলে একটা বই বের করল। বইয়ের পাতা কয়েকটা উল্টে, বুকমার্ক করা স্থানে গিয়ে বলল, “তোমার মতো গজদন্ত তার নেই। তুমি প্রতিবার হাসলে একটা করে কবিতা রচিত হয়!”

“আপনি সবসময়ই বাড়িয়ে বলেন!”, অভিযোগের সুরে বলল রুপা। নির্জনের মনে হলো, প্রশ্রয়!

“বাড়িয়ে বলছি না মোটেও। তোমার মুখ, তোমার গড়ন, হাসি- সবকিছুর মধ্যে ছন্দ আছে যেন। ভায়োলিনের সুমিষ্টি মূর্ছনার মতো! ফল করতেই হয়!”

রুপার মুখ লাল হয়ে গেল। ও হয়তো কোনদিন সামনাসামনি কারো মুখ থেকে এমন প্রাণখোলা প্রশংসা শোনেনি।

“আপনার হাতে ওটা কি বই?”, নির্জনের মুখ বন্ধ করতেই বোধহয় প্রসঙ্গান্তরে গেল রুপা!

“আবুল হাসানের ‘যে তুমি হরণ করো’!”, বলল নির্জন। তারপর যোগ করল, “তবে। চোখের সামনে মূর্তিমতী কাব্য রেখে কার মন চাইবে কবিতা পড়তে?”

“আপনার সাথে আর পারা গেল না!”, লেপ গায়ে মুড়ে বালিশে হেলান দিয়ে বলল রুপা। “আপনি এভাবে সব মেয়ের প্রশংসা করেন?”

“না।”, সংক্ষেপে একশব্দে জবাব দিল নির্জন।

নির্জন দেখল, রুপার গালের রঙ গাঢ়তর হয়েছে, যেন রক্ত জমতে শুরু করেছে গালে। কেউ যেন লাল রঙের ডিব্বায় ইজেল চুবিয়ে ছুঁইয়ে দিয়েছে গালে। তাকিয়ে রইল মুগ্ধ চোখে।

কী মনে করে লেপ সরিয়ে উঠল রুপা। কেবিনের বাইরে বেরিয়ে ফিরে এলো আবার। অধরে* ঠোঁট কামড়ে হাসিমাখা মুখে বলল, “ওরা কিন্তু দরজা লাগিয়ে দিয়েছে!”

“দেয়ারই কথা! সারারাত তো গেট খোলা রাখবে না!”, নির্জন বলল।

“এতক্ষণে শুরু হয়ে গিয়েছে হয়তো!”, দুষ্টুমি হাসি ধরে রেখে বলল রুপা।

বইটা রাখল নির্জন দুজনের মাঝখানে। বলল, “আমরাও লাগিয়ে দিয়েছি দরজা। অনেকেই হয়তো ভাবছে, আমরাও করছি!”

চোখ নামিয়ে নিল রুপা। বলল, “তা বটে!”

“তবে আমার মনে হয়”, মুখ তুলে বলতে লাগল রুপা, “আমাদের ইনভেস্টিগেট করার বেশি কিছু নেই। হোটেলে এরা দুজন আলাদা আলাদা রুমে থাকছে কিনা, জানলেই সবকিছু জানা হয়ে যাবে। আর ৪ জনের জন্য কেবিন নিয়ে যাচ্ছে মাত্র দুজন, এতেই তো অনেকটা বোঝা হয়ে যায়, তাই না?”

“সেটা বড় কথা নয়। তাহমিনা হায়াতের এফেয়ারের ব্যাপারটা মনে হয়, জুলফিকার আমান ধরতে পেরেছিলেন। তার পেছনে আমাদের লেলিয়ে দেয়ার কারণটা হয়তো ভিন্ন!”

“মানে?”, বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল রুপা।

“একটু মাথাটা খাটাও, অজিত। মস্তিষ্কটা ভগবান দিয়েছেন ভাবার জন্য, কাজে লাগাও!”

সিনেমার ব্যোমকেশের গলা নকল করে বলতে চেষ্টা করল নির্জন। রুপা, হেসে ফেলে, বলল, “থাক! আপনাকে সত্যান্বেষী সাজতে হবে না আর। আপনি মানেটা বলুন!”

“মানেটা হলো, প্রত্যেকটা মুসলিম বিয়েতেই মোহরানা ধার্য করা হয়, জানো তো? এই মোহরানা দেয়াটা স্বামীর দায়িত্ব। বেশিরভাগ সময়ই এই মোহরানা অল্প টাকা ধরা হয়। কোন কারণে বিয়ে ভেঙ্গে গেলে, স্বামী এই টাকাটা পরিশোধ করে ডিভোর্স দিয়ে দেয়। ভেজাল লাগে, যখন মোহরানার অংকটা বেশি হয়। ধরো ২০ লাখ কিংবা ১ কোটি, তখন স্বামী চাইলেও ডিভোর্স দিতে পারে না!”

“হ্যাঁ তো?”

“স্বামী সেসব ক্ষেত্রে স্ত্রীকে ডিভোর্স দিতে বলে। তালাকের সাথে যদিও মোহরের সম্পর্ক নেই, কিন্তু স্ত্রী ডিভোর্স দিলে এক্কেবারে টাকাটা না দেয়ার সম্ভাবনা থাকেই। আমার মনে হয়, জুলফিকার হায়াতও তাই চাইছেন। তিনি যদি তার স্ত্রীর পরকীয়ার প্রমাণ হাতে পান, তবে তিনি স্ত্রীকে বাধ্য করাতে পারবেন তাকে ডিভোর্স দিতে। তাকে আর মোহরানার বিশাল অঙ্কের টাকাটা দিতে হবে না!”

“এভাবে তো ভেবে দেখিনি!”, বিস্মিত ঘোর লাগা গলায় বলল রুপা।

“স্ত্রীর পেছনে ইনভেস্টিগেটর, মানে আমাদের নিয়োগ করতে তিনি প্রচুর খরচা করছেন। জুলফিকার আমান ব্যবসা করেন, রুপা! ব্যবসায়ীরা একটা টাকাও প্রোফিট ছাড়া ইনভেস্ট করেন না!”

উপরের বার্থে উঠে এলো নির্জন।  রিডিং ল্যাম্প জ্বালিয়ে চোখ চালিয়ে যেত লাগত কবিতার লাইন ধরে। মন বসাতে পারল না। এমন মৃদু ঘুমঘুম দুলনিতে কবিতার দুর্বোধ্য ছন্দ আর অন্তর্নিহিত অর্থে মনোযোগ দেয়াটা কষ্টকর।

“আচ্ছা একটা কথা!”, নিচের বার্থ থেকে বলল রুপা!

“আপনি আমার চেহারার আজ এত প্রশংসা করলেন কেন বলুন তো? আগেও তো আমাকে দেখেছেন কতবার! এভাবে বলেননি কোনদিন!”

বইটা বন্ধ করে নির্জন বলল, “সুযোগ পাইনি হয়তো। তবে সুযোগ করে নেয়া উচিৎ ছিল!”

কোন জবাব এলো না। ওকে নিরুত্তর থাকতে দেখে নির্জন বলল আবারও, “ইউ আর আ বিউটি, রুপা। ইউ সুড গেট ইউজড টু বিইং এডমায়ার্ড!”

“চারটায় উঠতে হবে। ঘুমিয়ে পড়ুন। ঠিক সময়ে উঠতে না পারলে সকালে দেখব, আমরা শ্রীমঙ্গলের বদলে সিলেট পৌঁছে গেছি!”

রিডিং লাইটটা নিভিয়ে দিল নির্জন। এবারে অন্ধকার- চার্জার পোর্ট থেকে আলো আসছে শুধু। নিচের বার্থ থেকে রুপার নিঃশ্বাসের শব্দ আসছে কানে। চোখ বন্ধ হয়ে এলো ওর। প্রস্তুতি এখন সাময়িক মৃত্যুর।
****
সকালের আলো ভালো মতো ফোটার আগেই, যখন পাখিরা উসখুস করছে নীড়ে, ঘুমঘুম শ্রীমঙ্গল স্টেশনে ঢুকল উপবন এক্সপ্রেস। একঘণ্টা আগেই ঘুম থেকে উঠে ফ্রেস হয়ে নিয়েছে ওরা। রুপার মুখ ঘুমকাঁতর- ফুলে আছে চোখদুটো। নির্জন মাথা মুখ পেঁচিয়ে নিয়েছে পুরু মাফলারে। ঠিক করেছে, ওয়েটিং রুমেই খুলে ফেলবে মুখ থেকে অস্বস্তিকর ফ্রেন্সকাট আর আচুল।

শ্রীমঙ্গল স্টেশনে খুব বেশি লোক নামেনি ট্রেন থেকে। তাহমিনা হায়াত আর সেই অধ্যাপক, কয়েকজন কমবয়সী ছাত্রছাত্রীর একটা গ্রুপ আর ওরা দুজন।

তাহমিনা হায়াত আর সেই অধ্যাপক ট্রেন থেকে নেমেই স্টেশন ত্যাগ করলেন- হয়তো গেলেন সিএনজির খোঁজে।

রুপা বলল, সেদিকে তাকিয়ে, “আমরা এখন ওদের সাথে যাবো? পিছে পিছে?”

“না”, বলল নির্জন। “জানি, ওরা কোথায় যাচ্ছে। বেকার ফলো করার কী দরকার। এখানেই চেনজ করে নেব দুজনই। তারপর ধীরেসুস্থে চারপাশটা দেখতে দেখতে হাজির হবো হোটেলে!”

বেশ বড় স্টেশন, জেলা শহর হিসেবে। প্ল্যাটফর্মের এখানে ওখানে কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়েছে অনেকেই; এরা মূলত ভিখারি। কুয়াশায় রহস্যাবৃত চারদিকটা- দশ হাত দূরের জিনিসও ঠিকঠাক চোখে আসছে না। সারারাত জ্বলে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া আদিকালের লাল বাল্বগুলো জ্বলছে সহস্রাব্দী আগেই মরে যাওয়া আলোকবর্ষ দূরের নক্ষত্রের মতো, মিটমিট করে।

ওয়েটিং রুমে এসে চেঞ্জ করল ওরা। নির্জন গুলিস্তানি কোটটা খুলে গায়ে চাপাল গতবছর ট্যানারি মোড় থেকে অর্ডারে বানিয়ে নেয়া চামড়ার জ্যাকেট, পায়ে গলিয়ে নিল এপেক্সের জুতা; ঢোলাঢালা প্যান্ট বদলে, পরল গ্যাবারডিন।

রুপা বোরখা খুলে স্বাভাবিক পোশাকে প্রত্যাবর্তন করেছে। একটা উলের টুপিতে ঢেকে রেখেছে কান- আরো বেশি আদুরে আর কমবয়সী লাগছে লাগছে ওকে।

“এক কাপ চা পেলে মন্দ হয় না, কী বলো?”, ব্যাকপ্যাকটা কাঁধে নিয়ে বলল নির্জন।

রুপার মুখে ঘুম কম হওয়ার ক্লান্তি। কিন্তু চোখদুটো পাখির মতোই চঞ্চল- সজীব। কয়েকবার পলক ফেলে, চুখদুটো টার্বাইনের মতো ঘুরিয়ে, বলল, “জমে যাবে একদম। চায়ের রাজধানীতে এসেছি, দেখা যাক, কেমন চা বানায় এরা!”

স্টেশন থেকে বের হতেই ওদের ঘিরে ধরল সিএনজিওয়ালারা। লাউয়াছড়া, মাধবপুর লেক, হামহাম ঝর্ণা- সব একদিনেই দেখিয়ে আনতে ওরা কত নেবে, আলাদা আলাদা করে যেতে কী কী সমস্যা, সবিস্তার বলতে লাগল একসাথে।

নির্জন ওদের পাত্তা না দিয়ে এলো একটা চায়ের দোকানে। “তুমি চাঁদের জোছনা নও, ফুলের উপমা নও, নও তুমি পাহাড়ি ঝর্ণা”- এন্ড্রু কিশোরের মহুয়া কণ্ঠের গানটা বাজছে সাউন্ডবক্সে, এমন কাকভোরেও। দিনের প্রথম সিগারেট জ্বালিয়ে, চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, “তুমি তো এর আগে এসেছিলে একবার, তাই না?”

“হ্যাঁ। সীমান্তের সাথে।“

“সীমান্তের সাথে ব্রেকাপ হলো কেন?”

প্রশ্নটা করা যে ঠিক হয়নি, বুঝতে পারল কথাগুলো উচ্চারিত হওয়ার পর। বন্দুকের গুলি আর মুখের কথা- সিগারেটে টান দিল নির্জন।

“বনিবনা হচ্ছিল না!”, খুব বেশি গুরুত্ব না দিয়ে সংক্ষেপে বলল রুপা।

“আমাদের টিএসসির চা আর এই চায়ের তো দেখি কোন পার্থক্য নেই!”, অস্বস্তিকর প্রসঙ্গ চাপা দিয়ে বলল রুপা।

উত্তরটা দিল চাওয়ালাই। বলল, “আমরাও প্যাকেটের চা’ই বেচি। চা সারাদেশেই এক!”

চা শেষ করে বেশ কিছুক্ষণ দরাদরি করে একটা সিএনজি ঠিক করল নির্জন। সিএনজিতে উঠেই বলল, “লাউয়াছড়া কথা উঠলেই সবাই শ্রীমঙ্গলের কথা বলে। ওটা কিন্তু আসলে কমলগঞ্জ উপজেলায় পড়েছে!”

ঘুমন্ত শ্রীমঙ্গল শহর পেরিয়ে ফাঁকা রাস্তায় এসে পড়ল ওদের সিএনজি। কুয়াশা কাটতে শুরু করেছে, সুর্যের কোমল শিশুরশ্মি হামলে পড়ছে পথের গাছগুলোর ঘন সবুজ, হলুদ সবুজ, হালকা নীল পাতায়। বাড়িঘর খুব বেশি চোখে পড়ছে না। কিছু দূরে দূরে সাইনবোর্ডে টুরিস্ট পুলিশের নাম্বার দেয়া। কিছুক্ষণের মধ্যেই চা বাগান চোখে পড়ল ওদের।

রুপা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, “কী সুন্দর তাই না? মনে হচ্ছে সবুজ উঁচুনিচু গালিচা!”

নির্জন হাসল। বলল, “চাবাগান দেখে আনন্দিত হওয়ার কিছু নেই। চা বাগান না থাকলেই বরং ভালো হতো!”

বিরক্তি নিয়ে নির্জনের দিকে তাকাল রুপা। বলল, “আপনি সবকিছুই একটু বেশি বোঝেন আর জানেন!”

“তা একটু বুঝি আর জানি বটে! একারণেই তোমার মতো সবকিছুতে উদ্বেলিত হতে পারি না! নোইং, সামটাইমস, ইজ আ কার্স!”

বাইরে থেকে চোখ ফিরিয়ে রুপা নির্জনের দিকে তাকিয়ে বলল, “কী বেশি জানেন আর বোঝেন, শুনি?”

“চা বাগান নিয়ে তোমার রোম্যান্টিসিজম নষ্ট করতে চাই না”, হেসে বলল নির্জন। “তুমি দেখ!”

কৌতুক বোধ করল নির্জন রুপার বিরক্ত মুখ, সংকুচিত চোখ দেখে।

“না বলুন আপনি! আমি শুনব!”, জেদ ধরে বলল ও।

“দেড়শো বছর আগেও বাঙ্গালীরা চা খেতে জানত না, জানো তো? ঐ সময়কার সাহিত্যে চায়ের উল্লেখ নেই! সেসময়ে ইউরোপে, বিশেষকরে ইংল্যান্ডে চায়ের প্রচণ্ড চাহিদা। ইংরেজরা তখন ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে চা চাষ শুরু করে। পাহাড় সাফ করে চা বাগান করা হয় এসব অঞ্চলে। সেসব পাহাড়ে প্রাকৃতিক জঙ্গল ছিল, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ছিল, অনেক আদিবাসী গোষ্ঠীর বাস ছিল। আস্তে আস্তে সব ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন এ অঞ্চলে বন্যহাতি দেখাই যায় না! কতধরনের বেড়াল ছিল- মর্মর বেড়াল, মেছো বেড়াল- সেসব দেখতে হলে এখন চিড়িয়াখানায় যেতে হচ্ছে। কত পাখি নেই হয়ে গেছে। এখনো যা টিকে আছে, বনজসম্পদ আর বনভূমি- সেসবও ধ্বংস হয়ে যাবে পর্যটনের চোদনে, দেখে নিও।”

বেশ বড় একটা বক্তৃতা দিয়ে থামল নির্জন। রুপা পুরোটা সময় তাকিয়ে ছিল ওর মুখের দিকে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “ঠিক বলেছিলেন আপনি! নোইং ইজ আ কার্স! আমি এসব নিয়ে ভাবতে চাইনা। ভবলে তো সেসব হারিয়ে যাওয়া প্রানী ফিরে আসবে না!”

“ভাবলে সেসব প্রাণী ফিরবে না বটে, তবে নতুন করে কোন প্রজাতি বিলুপ্ত হবে না!”, সামান্য হেসে বলল নির্জন।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা পৌঁছে গেল ‘নির্সগে’।
মতামত জানাতে- [email protected]