প্রতিহিংসা পর্ব ২


আমি রাজেন্দ্র কে দু বৎসর যাবৎ চিনি। শেষ এক বছর ধরে ও আমার কাছে নিয়মিত আসে। এই বছর খানেক ধরে আমি অনেকটাই বুঝতে শিখেছি ওকে। আমি খুব ভালো করেই জানতাম রাজেন্দ্র নিজের লক্ষ্যে প্রচণ্ড ভাবে স্থির। একটা শিকারি বাঘের মত ওর মনটা। কিন্তু কখনই বুঝিনি কাজটা ও এত তাড়াতাড়ি সম্পন্ন করে ফেলবে। সেদিন সকালে এই নাচঘরে বসেই আমি আর আমার সখী মন্ডলী নৃত্য অনুশীলন করছিলাম। হটাৎ সামনের বড়ো জালনাটায় চোখ পড়ল। জালানার ছিদ্রগুলো দিয়ে দেখলাম সামনের পথটায় ধুলো উড়িয়ে একটা ঘোড়া ছুটছে। ঘোড়ার পিঠে থাকা মানুষটার পোশাক দেখে বুঝলাম রাজদূত। বুঝতে পারলাম সবকিছু। বাইজি কুঠির সামনের পথটা সোজা চলে গেলে বিভাকরের সীমানায়। গোধূলিতে আবার দেখলাম তিন চারটে বড় ঘোড়ার গাড়ি ঘোড়ায় বসা দশ বারো বল্লমধারী সিপাহী আর সঙ্গে সকালের সেই ঘোড়ায় চাপা দূতটা রাজেন্দ্রর প্রাসাদের পথে। রাজদূত ছাড়া কারো পোশাকই আমাদের এখানকার মতন না।

রাত তখন দু পহর ঘুম ভেঙে গেলো প্রচণ্ড শব্দে। জালানা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম সারা রাস্তা জুড়ে মশাল আর তরোয়াল, বন্দুক নিয়ে সিপাহীরা এদিক ওদিক ছুটছে। সিপাহীদের হই হট্টগোল আর বন্দুক গোলায় সমস্ত মুর্শিদাবাদ কেপে উঠছে। আমার হৃদপিণ্ড ধুকপুক করতে আরম্ভ করলো। তাহলে আমার রাজেন্দ্র কি সত্যি নিজের কার্যসিদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে? সহী বিমলাও দৌড়াতে দৌড়াতে ঘরে ঢুকলো।
__ কি হয়েছে রে বিমলা?
বিমলা হাপাতে হাপাতে বললো,
__ শুনেই তোকে বলতে এলাম। মহারাজ রঘু রায় চৌধুরী খুন হয়েছেন, ওনার ভাই বিভাকর নাকি খুন করেছে মহারাজ কে। যুবরাজ রাজেন্দ্র রায় নাকি হাতেনাতে ধরে সিপাহী দিয়ে তাকে কারাগারে বন্দী করেছেন।
ওহ তাহলে বিকালের ঐ ঘোড়ার গাড়িতে একটায় বিভাকর ছিল। কেল্লা ফতে! আমাকে রাজরানী হওয়া থেকে কেউ আটকাতে পারবেনা তাহলে। মনে মনে খুব আনন্দ হতে লাগলো। কিন্তু মুখে এ সবের কোনো চিহ্ন ফুটে উঠতে দিলাম না। বরঞ্চ বললাম,
__ ঠিক আছে তুই যা নিজের ঘরে যা…

বিমলা কিছু না বলে কৌতূহলে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল। কিন্তু আমার আর ঘুম এলোনা। আমি আমার নরম বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। শোবার সময় বুক থেকে শরীর আঁচলটা সরে গেল। আমার শারা শরীরে শিহরন খেলছে। তাহলে এই এত চাওয়া পাওয়া অপূর্ণতা এবার পূর্ণ হতে চলেছে। এই প্রথম বুঝি কোনো নারী পতিতালয় থেকে উঠে রানীর মর্যাদা পাবে। এবার কোনো লুকোচুরি থাকবেনা। রাজেন্দ্র যখন তখন আমাকে জরিয়ে ধরে আমাকে নিজের ভালোবাসার স্বাদ দিতে পারবে। আমাকে আরামে ভরিয়ে দেবে। প্রবল আনন্দে নিজের হাতটা আপনা থেকে নিচে চলে গেলো। শায়ার ভেতর ঢুকে আঙুল খেলতে লাগলো নিজের যোনি পথের প্রবেশ দ্বারে। আরামে মুখ দিয়ে শুধু এ টুকুই উচ্চারণ হতে থাকলো,
__আহ আহ রাজেন্দ্র রাজেন্দ্র ….

সকালের আলো ফুটতে ফুটতে অনেক কিছু ঘটলো। মাঝরাতে নাকি মুর্শিদাবাদের ব্রিটিশ জেনারেল কিছু সৈন্য সামন্ত নিয়ে রাজেন্দ্রর কাছে এসেছেন। তিনি আগে থেকেই এই নব তরুণ রাজেন্দ্রর ব্যাক্তিত্ব এবং রুদ্র প্রতাপে প্রচণ্ড প্রভাবিত ছিলেন। তিনি মনে করেন সারা বাংলাকে ব্রিটিশদের যদি ঠিকমত শাসন করতে হয় তবে এমনি ক্রুর আজ্ঞাবাহী রাজার প্রয়োজন। সকালের সূর্য্য উদয় হতেই জেনারেলের সমর্থনে রাজেন্দ্র নিজেকে নতুন রাজা হিসাবে ঘোষণা করলো। আর প্রধান মন্ত্রী করা হল সুখচাঁদকে। রাজেন্দ্র রাজা হতেই সবার প্রথমে নিজের পিতার সৎকার সম্পন্ন করল। তারপর প্রাসাদে ফিরে প্রথমে তার ছোটোকাকা বিভাকরের সঙ্গে আসা তার দেহরক্ষী দের কচুকাটা করল। বিকাল গড়ালে জেনারেল রাজেন্দ্রকে জানালেন রাজেন্দ্রর পিতার মৃত্যুর খবরে সমগ্র ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রচণ্ড শোকাহত। দস্তাক্ষরে সাক্ষ্যরের মাধ্যমে তিনি আরও জানালেন, রাজ খুনের মত জঘন্যতম অপরাধের জন্য বিভাকরের সঙ্গে রাজেন্দ্র যা খুশি করতে পারেন। এমন কি তার রাজত্ব, রাজস্ব, যা কিছু বিভাকরের আছে তা ইচ্ছে করলেই নিজের দখলে আনতে পারেন। ব্রিটিশরা এতে কোনোভাবে হস্তক্ষেপ করবে না।

দস্তাক্ষর হাতে ধরেই রাজেন্দ্রর চোখ আগুনের মত হয়ে উঠল। নিজের ঘরে একা একা হো হো করে হেসে উঠলো। যা চেয়েছিল সেটাই হল। বেচেঁ থাকতে যে লাভ হয়নি নিজের ছেলের হাতে খুন হয়ে রাজেন্দ্রকে সেই লাভ করিয়ে দিয়ে গেল পিতা। মনে মনে রাজেন্দ্র বলতে লাগলো,
__ বিভাকর নিজেকে খুব বুদ্ধিমান ভাবতে তাই না। তুমি ভেবেছিলে অজগর সাপের মত আস্তে আস্তে এই রাজ্যটাকে গিলে নেবে। কিন্তু দেখ আজ আমি তোমার হাঁটুর বয়সী হয়েও সিংহের মতো এক থাবায় তোমার সবকিছু কেড়ে নিলাম। তোমার রাজত্ব কারলাম, রাজ পোষাক করলাম এবার তোমার চাদের চেয়েও অপরূপ সুন্দর স্ত্রীটিকে কেড়ে আনবো। তাকে টেনে এনে নিজের বিছানায় এনে ফেলবো। আমার দেহের আগুনে পুড়িয়ে ছারখার করবো তোমার অমন সুন্দরী রানিটিকে।

ব্রিটিশরা যখন রাজ মহল থেকে প্রস্থান নিল তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হবে হবে। তারপর পরই মুষলধারে বৃষ্টি নামলো। সেই প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে দেখা গেল বিরাট এক সেনার দল শিকারি বাঘের মত ঘোড়ায় চেপে বিভাকরের রাজ্যের দিকে চলেছে। তাদের নেতৃত্বে রয়েছে সুখচাঁদ। বাইজি প্রাসাদের সামনেও একটা সুসজ্জিত রথ এসে দাড়ালো। আমি জানতাম রাজেন্দ্র কথার খেলাপ করেনা। আমাকে সখিগণেরা উল্লাসের সঙ্গে সাজিয়ে গুছিয়ে দিল। তারপর সবাই ধরে রথে তুলে দিল। রথ চলতে শুরু করল রাজ প্রাসাদের দিকে। প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যেও রথের খিড়কি দিয়ে স্পস্ট দেখতে পেলাম ধীরে ধীরে প্রকাণ্ড রাজপ্রাসাদ খানা আমার দিকে এগিয়ে আসছে। প্রচণ্ড আবেগে চোঁখের কোন থেকে জল গড়িয়ে মুখ ভাসিয়ে দিল।
বিভাকরের রাজ্য তখনো কিছু জানেনা। যারা বিভাকরের সঙ্গে আসা সবাই মরেছে। কে কোনো উ খবর পাঠাতে পারেনি। কিন্তু প্রাসাদের মধ্যে নিজের নরম বিছানায় উবুড় হয়ে পরমা সুন্দরী রানী নয়নতারার মন কেন জানিনা কিসের অজানা আশঙ্কায় চঞ্চল হয়ে উঠছিল। লতার মত ঘন চুলের রাশিগুলো কখন মসৃন পিঠ থেকে খসে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছে তিনি খেয়াল করেননি।
__ রানী মা সারাদিন কিছু খাননি আপনি। এখন কিছু খাবেন চলুন।

নিজের দাসীর কোথায় চোখ ফেরালো নয়নতারা। কাজলের সঙ্গে মাদক মিশিয়ে পরে বুঝি ওই দুটি চোখে। কি নেশাতুর! দাসীর কথায় তার নরম লাল ঠোঁটদুটো কেপে উঠল
__ না গো কঙ্কা, আমার খেতে ভালো লাগছেনা
দাসী আস্তে করে এগিয়ে এসে ওনার চুল গুলো দুহাত দিয়ে গুছিয়ে মেঝে থেকে তুললো। সেগুলো নয়নতারাকে পাশে গুটিয়ে রেখে বলতে লাগলো,
__ তা বললে হয় রানী মা, রাজা মশাই শুনলে তো রাগ করবেন
__ আহ বলছিনা খাবোনা। আচ্ছা তোমাদের রাজা এত দেরি কেন করছেন বলোতো?
তারপর সোজা হয়ে পালঙ্কের উপর বসলো নয়নতারা। আবার দাসীকে বলতে লাগলো
__এমন তো হয়না। ওই যে আমার ভাসুরের দূত এসে নিয়ে যাওয়ার পর প্রায় এক রাত একদিন কেটে গেল। জমি ভাগাভাগিতে কি এত সময় লাগে?
বলে নয়নতারা আলতা আর নূপুর পরা পা দুটো পালঙ্ক থেকে ঝুলিয়ে দিলো। দাসী মেঝেতে বসে সেই নরম মসৃণ পা দুটো নিজের হাত দিয়ে টিপে দিতে লাগলো
__ রানী মা আপনি তো শুধু একজন নারী নন, আপনি তো স্বর্গের দেবী। আপনার মত এত ধৈর্য এত বুদ্ধিমতি আর কে আছেন? আপনার মুখে কি এই কথা মানায়? আপনি তো জানেনই রাজপাঠ আর রাজনীতি কতটা জটিল। এর সমাধানের কোনো সঠিক সময় নির্ধারণ করা যায়? আপনি আর বিচলিত হবেন না। হয়তো তিনি এই প্রচণ্ড বরষা দেখে ওখানেই আছেন। কাল সকাল হতেই রওনা দেবে
দাসীর কথায় নয়নতারার বিচলিত মনটা একটু শান্ত হলো। গলার সুরটা এবার নরম হয়ে এলো
__ বহন্নলা খেয়েছে?
বিহন্নলা রাজা বিভাকর এবং রানী নয়নতারার একমাত্র কন্যা। মায়ের মুখের মতোই অপরূপ মুখের গড়ন পেয়েছে সে। এই সামনের যোষ্ঠে মেয়েটির তিন বৎসর পূর্ণ হয়েছে। দাসী উত্তর দিল,
__ হ্যাঁ খেয়েছে। তাকে আমি খাইয়ে অনেক আগেই তার ঘরে ঘুম পাড়িয়ে এসেছি। আপনিও কিছু খেয়ে নিন এবার রানী মা…
__ আচ্ছা এতকরে বলছো যখন নিয়ে এসো যাও…

নয়নতারা মৃদু হেসে সম্মতি জানালো। হাসলে যে তার রূপের মাধুর্য্য আরও কতগুণ বেড়ে ওঠে যারা দেখেছে শুধু তারাই জানে। দাসী কঙ্কাও হেসে ঘর থেকে বেরতে যাবে হটাৎ বিকট একটা শব্দে সারা মহল কেপে উঠলো। রানী আর দাসী প্রথমেই দুজন ভাবলো এই প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে মহলের উপর বুঝি বজ্র এসে পড়লো। কিন্তু একটু পরেই তেমন কান ফাটানো শব্দ আবার হয়ে উঠলো। তারপর অনবরত চলতেই লাগলো। প্রচণ্ড বর্ষার মাঝেও শোনা যেতে লাগলো ব্যস্ত মহলরক্ষীদের চিৎকার।

সুখচাঁদের আদেশে তার সেনারা প্রচণ্ড বর্ষার ভেতরে আক্রবন করে বসেছে। অল্প সংখ্যক অপ্রস্তুত মহলরক্ষিরা পেরে উঠলোনা সেই অক্রবন রুখতে। সুখচাঁদের সঙ্গে যে সেনার দল পাঠানো হয়েছিল তারাা প্রচন্ড পরাক্রমী, উন্নত পশিক্ষণ প্রাপ্ত এবং বরষা কিংবা খরা দু জায়গায় লড়তে অত্যন্ত পটু। তার উপর তাদের আরও একধাপ উন্নত কেড়েছে ব্রিটিশদের থেকে উপহার পাওয়া উন্নত ইউরোপীয়ান বন্দুক, কামান আর গোলা বারুদ। কিছুক্ষণের মধ্যে মহলের পহরীরা ধরাসাহি হলো। গুলিবিদ্ধ হল মহলের বেশিরভাগ প্রহরিরা। কেউ গুলিতে মরলো। আর যারা মরল না সুখচাদের আদেশে সেই সবাই কে তরবারি আর বল্লোমে কুপিয়ে খুন করা হলো। মহলে আর কোনো পুরুষ জীবিত রইলনা। মহলের সমস্ত সুন্দরী আর দাসদাসীরা বন্দী হলো। বন্দী হলো স্বয়ং রানী নয়নতারা এবং তার একমাত্র পুত্রি। দাসী কঙ্কা রানী ও তার মেয়েকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল কিন্তু মহল থেকে পালানোর আগেই সুখচাদের সেনারা রানীর কক্ষে প্রবেশ করে।

সুখচাঁদ নিজে বন্দী রানীর কক্ষে প্রবেশ করলো। রাণীকে চিনে নিতে তার একটুও অসুবিধা হলনা। ও রকম দাবদাহ কামনার আগুনে পরিপূর্ণ রূপ সবার হয়না। বৃষ্টিতে সুখচাঁদ এক্কেবারে ভিজে গেছে। মাথার ভেজা চুল একটু ঝেড়ে রানীর সামনে এসে দাড়ালো। রানীকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করতে থাকলো। রানীর রাগী ও সন্ত্রস্ত চোখদুটি সুখচাঁদ সহ্ ঘরের সব আক্রমণকারী বন্দুকধারী সিপাহিদের চোখ মুখে গিয়ে পরতে লাগলো। রানী নিজের পালঙ্কের পাশে দাড়িয়ে। কোলে শক্ত করে ধরে আছে তার মেয়েকে। দাসী কঙ্কা প্রচণ্ড ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে রানীর পাশে দাড়িয়ে। কথা শুরু সুখচাঁদই করলো, নিজের হাত জোড় করে রাণীকে কে প্রণাম করে হাসি মুখে খুব শান্ত ভাবে বললো,
__ নমস্কার দেবী, আপনার সৌন্দর্যের বর্ণনা বহু শুনেছি। আজ দেখলাম। কিন্তু আপনার রূপের প্রশংসা যতটা লোকের মুখে শুনেছি বাস্তবে আপনি তার থেকেও অনেক রূপসী। সত্যিই দেবী নয়নতারা আপনার মত এত রূপবতী নারী আমি আমার জীবনে কখনো দেখিনি
নয়নতারা সাপের মত ফোঁস করে উঠলো,
__ বয়স কতই বা তোমার, কি দেখেছো জীবনে এখনো তুমি। সামান্য একাট কিশোর হয়ে যে রানীর নাম নেয় সে যে কতটা আহাম্মক এবং কতটা উশৃঙ্খল তা বোঝাই যায়। সে দেখবে পৃথিবী।
__ হা হা সুন্দরী হাসালে তুমি, বয়সে কি আসে যায়। নারী তো নারী আর পুরুষরা পুরুষ। এবার আমার পরিচয় দেই। আমার নাম সুখচাঁদ, সমগ্র মুর্শিদাবাদের নতুন মহামন্ত্রী। আর আমার হাতে নয়নতারা আপনি এখন বন্দিনী। আর বন্দিনী শুধু বন্দিনীই হয়। আপনি করে বলছি এটাই অনেক
__ তুমি মন্ত্রী, দেখেছো আয়নায় নিজেকে? তুমি হয়তো বুঝতে পারছনা আমি কে? কাকে বন্দী বানিয়ে বিক্রম দেখাচ্ছো? শুধু কিশোর বলে এই দণ্ডের ছার পাবেনা তুমি, এখনো সময় আছে নিজের প্রহরী নিয়ে ফিরে যাও
সুখচাঁদ কথাটা শুনে হো হো করে হেসে উঠলো
__ দণ্ড কে দেবে রূপসী? এখন থেকে এই সমগ্র মুর্শিদাবাদে শুধু আমি আর আমাদের মহারাজ ছাড়া কারো দণ্ড দেবার ক্ষমতা নেই সেটা জেনে রাখুন
নয়নতারা এই প্রথম একটা প্রকাণ্ড ষড়যন্ত্রের পোড়া গন্ধ আচ করল। বিস্ময়কর চোখে গম্ভীর ভাবে প্রশ্ন করলো,
__ মুর্শিদাবাদের তো নির্দিষ্ট কোনো রাজা নেই। তাহলে রাজা কথা থেকে হলো। কে তোমাদের রাজা?
__ আমাদের মহারাজ আপনার অতি পরিচিত। আপনার ভাসুরের একমাত্র পুত্র, রাজেন্দ্র। তার পিতাকে হত্যা করে আপনার স্বামী বিভাকর এখন প্রাসাদের কারাগারে বন্দী

নয়নতারার বুক ধড়াস করে উঠলো। তার স্বামী ও তার দাদার মধ্যে রাজত্বের অধিকারে দ্বন্দ্ব মনোমালিন্য চলছিল। কিন্তু তা কখনই খুনোখুনি যুদ্ধের রূপ নিতে পারেনা। এ নিশ্চই তার ভাইপো রাজেন্দ্রর ষড়যন্ত্র। ওই টুকু ছেলে হলে কিহবে ওর চোখ দেখলে বোঝা যায় ও কি পরিমাণ শয়তান। প্রচণ্ড রাগে রানীর নরম লাল ঠোঁটদুটি কেপে উঠল,
___ এ ষড়যন্ত্র গভির ষড়যন্ত্র! আমি নিশ্চিত আমার স্বামীকে ফাঁসানো হয়েছে। আমি এর বিচার চাইতে কলকাতা যাব, বরলাটের কাছে..
__ সুন্দরী তুমি যে কোথাও যেতে পারবেনা এখন। কোথাও যেতে দেওয়া হবেনা। মহারাজ রাজেন্দ্রর প্রাসাদ তোমার জন্য অপেক্ষা করছে…

নয়নতারা রাগে চিৎকার করে বললো,
__ একটা রানী তো ছাড়ো, কিকরে একটা মহিলার সঙ্গে কথা বলতে হয় সে শিক্ষাও পাওনি নাকি? আমাকে তুমি বলে সম্মধন করার দুসাহস তোমার হয় কি করে…
কথা শেষ হলোনা,
__ সাহসের কি দেখেছ এখনো সুন্দরী? দেখাচ্ছি

সুখচাঁদ রানীর পাশ কাটিয়ে যুবতী দাসী কঙ্কার সামনে এসে দাড়ালো। তারপর মূহূর্তে তার চুলের মুঠি টেনে ধরলো। দাসী ভয়ে আর বেদনায় আর্তনাদ করে উঠলো। সেই ভয়ার্ত শব্দে রানীর কোলে থাকা ছোট্ট বিহন্নলাও ভয়ে কেপে উঠলো। নয়নতারা রাগে চিৎকার করে বললো,
–কি করছো তুমি? একটা নারীর গায়ে হাত দেবার দুঃসাহস করার ক্ষমতা কীকরে হয় তোমার? ছাড়ো ওকে নইলে
__ নইলে কি, কি করবে? আমার ক্ষমতা এখন কতখানি তা এখনো বুঝতে পারনি সুন্দরি? কি করবে তুমি যদি না ছারি? অনেক সময় পেরিয়েছে আর কথা বাড়াতে চাইনা। শোনো তুমি যদি সেচ্ছায় যেতে না চাও আদেশ আছে তোমার চুলের মুঠি ঠিক এরকম করে ধরে টানতে টানতে রাজপ্রাসাদে নিয়ে গিয়ে তোমাকে যেনো ফেলা হয়। নয়নতারা তুমি শুধু সুন্দরী নও প্রচণ্ড বুদ্ধিমতীও, এবার তুমিই ঠিক করো তুমি কি চাও….

রানীর সারা দেহ রাগে টকবক করে ফুটছে। কিন্তু সত্যিই সে খুব বুদ্ধিমতি, স্থিরবুদ্ধি। সে বুঝতে পারলো এখানে কিছুই হবেনা। রাজেন্দ্রর সামনে তাকে যেতেই হবে। ওখানে গিয়েই তার সঙ্গে কথা বলবে। তারপর উপযুক্ত সময় বুঝে সেখান থেকে কলকাতা রওনা দেবে। কিন্তু সে এটা কখনোই জানত না রাজেন্দ্রর মনে মনে কি অভিসন্ধি। সে যে মনে মনে নয়নতারা কে নিয়ে কি কি করবে এই বন্দি বাঘিনী এখনো তা আন্দাজও করতে পারেনি।