মেসেজটা রুদ্রর… এই অবধি দেখেই কিছুক্ষণ থ হয়ে বসে ছিল অয়ন। ক্লিক করে দেখার সাহস পাচ্ছিল না; একটু পরেই ভাবলো, এটা তো ওর ফেক একাউন্ট! রুদ্র’দা জানবে কী করে কে ও!
ভেবেই ও চ্যাট বক্স ওপেন করলো আর করতেই বাজ পড়লো অয়নের মাথায়!
রুদ্র জাস্ট লিখেছে…”অয়ন, বি এ ফার্স্ট সেম; তাই তো? কাল সঙ্গীত ভবনের তিনতলার ইউনিয়ন রুমটায় বেলা তিনটে নাগাদ ক্লাস শেষে দেখা করবি।”
অয়নের পায়ের নীচ থেকে মাটি সরে যাওয়ার অবস্থা, ওই অবস্থায় না থাকলে ও ভাবতে পারতো যে রুদ্র আন্দাজেই ঢিলটা মেরেছে, তাই অয়ন জাস্ট “কে অয়ন?!” লিখলেই চাপটা আর থাকতো না। কিন্তু সেসব ভাবার বুদ্ধি তখন লোপ পেয়েছে, ও গাধার মতো লিখে বসলো, “কিন্তু তুমি বুঝলে কী করে আমি অয়ন?”
রুদ্র শুধু মেসেজ সীন করে ছেড়ে দিলো। উত্তর নেই। আর ঘাঁটালো না অয়ন, কী থেকে কী হয়, যা দামড়া চেহারা রুদ্রদা’র, একটা থাপ্পড় দিলেই অয়নের প্রাণভোমরা পালাবে!
পরের দিন কথামতো ক্লাস শেষে বন্ধুদের এটা ওটা বলে কাটিয়ে অয়ন ধীরে ধীরে সঙ্গীত ভবনের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে থাকলো, ও পড়ে আর্টস বিল্ডিং এ, এখানে কখনো আসে নি। তিনতলা অবধি পৌঁছে অয়ন বুঝলো এখানে বিল্ডিং এর একটা উইং এ কাজ চলছে, মার্বল কাটার মেশিনের আওয়াজ আসছে, হাতুড়ির ঠকাং ঠকাং আসছে। আরেকটা উইং একদম সুনসান, ভূতুড়ে। বুঝলো সেখানেও কাজ শুরু হবে এখনও হয়নি, মিস্ত্রীরা কেউ এই উইং টায় আসছে না, সব কাজ ওইদিকে হচ্ছে। কিন্তু এইদিকটা ফাঁকা। লম্বা করিডোর ধরে অয়ন হাঁটতে থাকে, সব শেষের ডানদিকে একটা দরজায় প্রায় পড়া যায় না এমনভাবে লেখা, ইউনিয়ন রুম। পুরো ঘরের ভেতরটা ধুলোয় ভর্তি, দু তিনটে হাঁচি ফেললো অয়ন। তারপর একটা বেঞ্চে ফুঁ দিয়ে ধুলো উড়িয়ে কোনোরকমে বসলো।
বসে অপেক্ষা শুরু করতেই অয়নের শিহরন শুরু হয়ে গেল। পৌঁছে গিয়েছে সে। এবার? রুদ্র’দা আদৌ আসবে তো? কী হবে আজ?
একটা একটা মিনিট এক একটা বছরের মতো কাটছে তার। অয়ন মাটির দিকে তাকিয়ে হাতে মুখ গুঁজে বসেছিল। এমন সময় খুব ধীর শান্ত জুতোর শব্দ আসতে লাগলো। চমকে সিধে হয়ে বসলো অয়ন। তাহলে কি সেই আসছে? জুতোর শব্দ বাড়ছে, এদিকেই কেউ আসছে। ধীরে ধীরে দরজায় এসে দাঁড়ালো, অয়নের বর্তমান ক্রাশ, যাকে একবার দেখেই চোখ ফেরাতে পারেনি অয়ন, আজকাল পিজি’র ঘরে নিজেই মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে চোখ বন্ধ করে অয়ন কল্পনা করে রুদ্র’দা সেই জীম শর্টস টা পরে সামনে স্ট্রংলি দাঁড়িয়ে আছে… সেই সুঠাম সুপুরুষ অস্তিত্ব দরজা দিয়ে ঢুকে এলো ধীর পায়ে। অয়নের হৃৎপিণ্ড খুব মজবুত বলতে হবে, নইলে এতক্ষণে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসতো, যা লাফাচ্ছে ব্যাটা রুদ্র’দাকে দেখা মাত্র!
রুদ্র সটান এগিয়ে এসে দাঁড়ালো অয়নের সামনে, পরনে আজ একটা হালকা নীল ফুল টীশার্ট, গ্রে জীনস, আজকেরটা স্কিনী বা স্লিম ফিট। থাইয়ের বেড় আরো বেশী বোঝা যাচ্ছে। অয়ন খুব কষ্টে নিজেকে সামলে স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে রুদ্র’র মুখের দিকে।
“কী? ফেক একাউন্ট থেকে ফলো করা কেন?”
অয়ন যেন একটু ভেবলে গেল প্রথম অ্যাটাকে। আমতা আমতা করে বললো, “আমি… আমি…মানে আসলে আমি তো বলিনি…না মানে আমি তো তোমাকে মানে আপনাকে আসলে একটু…”
“বুঝেছি।”
সব চুপ। অয়নের দিকে তাকিয়ে রুদ্র। হঠাৎ প্রশ্ন করলো, “কী চাস তুই আমার কাছে?”
এবার অয়ন মুখ খুলতে গিয়েই বিষম খেয়ে গেল। তাও কেমন মোহে আর খানিকটা জেদে বলে চললো, “দাদা আমি তোমাকে সেইদিন দেখার পর ওই ইন্সটা’তে দেখি আমি মাঝে মাঝে এখানে তোমাকে খুঁজি তুমি না আসলে আমার ভালো লাগে না।” এক দমে দাঁড়ি-কমা-হীন বলে গেল অয়ন।
রুদ্রঃ আর?
অয়নঃ মানে?
রুদ্রঃ তুই যা করছিস দেখলে যে কেউ বলে দেবে এটা শুধু একজন জুনিয়র ‘ভাই’ এর কীর্তি হতে পারে না। কী চাস তুই? ঠিক করে উত্তর দে নইলে এখানে পড়াশোনা বন্ধ করে দেবো আমি তোর।
অয়ন এবার কেঁদে ফেললো। বেঞ্চ থেকে নেমে সত্যি সত্যি হাঁটু গেড়ে বসলো মেঝেয়, রুদ্র’র ঠিক সামনে।
অয়নঃ আমি মনে মনে নিজেকে এইভাবে দেখি রোজ। তোমার সামনে। আমি জানিনা তুমি স্ট্রেইট না বাই না গে, জানতেও ইচ্ছে হয় নি। আমি নিজেও জানি না আমি ঠিক কোনটা। কিন্তু যেদিন থেকে তোমাকে দেখেছি, আমি শুধু তোমার স্লেভ হওয়ার স্বপ্ন দেখি রুদ্র দা, তোমার পায়ের তলায় থাকতে ইচ্ছে করে সারাক্ষণ। তোমার অর্ডারস ফলো করতে ইচ্ছে করে। তুমি আমাকে বা আমার কথাকে মেনে নাও বা না নাও, প্লীজ বাইরে গিয়ে কাউকে এগুলো বোলো না। ওরা জানলে আমাকে নিয়ে মজা হবে, আমার আত্মহত্যা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
রুদ্রঃ কী করে বুঝবো তুই সাবমিসিভ? কতটা সাবমিসিভ? কী করতে পারবি আমার জন্যে?
অয়নঃ তুমি যা বলবে, যখন বলবে সেটাই করবো আমি। বলো কী করলে তুমি বুঝবে? রোখ চেপে গিয়েছে অয়নের।
রুদ্রঃ সাবমিসিভ হতে চাইলে সমস্ত ইগো ঝেড়ে ফেলতে হয়। পারবি সেটা তুই?
অয়নঃ পারবো আমি, তুমি যখন যা বলবে, তাই করবো রুদ্র দা।
রুদ্রঃ বুঝলাম। এখন নিজেকে প্রমাণ কর। না পারলে ভুলে যাবি আমাকে।
অয়নঃ সব কিছু করবো তোমার জন্যে। সব। আমাকে তোমার স্লেভ হতে দাও রুদ্র দা। প্লীজ!
রুদ্রঃ ঝেড়ে ফেলেছিস ইগো? আর কিছু খারাপ লাগবে না তো? দ্যাখ ভেবে। একবার এগিয়ে এলে আর পেছনে ফিরে যেতে পারবি না।
অয়নঃ আমি মন থেকে তোমার স্লেভ হয়েই গেছি, তুমি আজ যদি আমাকে না নাও, তাহলেও। আমার নিজের ইচ্ছে ইগো বলতে কিচ্ছু নেই তোমার সামনে।
সত্যিই সব ঘোরের মধ্যে বলছে অয়ন, ও আসলে নিজের ফ্যান্টাসির দুনিয়া তেই আছে। বাস্তব কী হতে পারে, জানে না। ধাক্কাটা খেল, এইবার।
রুদ্র হঠাৎ বললো, “প্রমাণ কর। নে, আমার জুতোটা পরিষ্কার করে মোছ।”
অয়ন পকেট থেকে রুমাল বার করে রুদ্র’র জুতো মুছতে যাবে হঠাৎ পা সরিয়ে নিল রুদ্র। বললো, “এটা যে কেউ পারে। স্লেভ রুমাল না, মুখ দিয়ে, জীভ দিয়ে পরিষ্কার করবে। কর দেখি।”
অয়নের হঠাৎ বমি পেল। এই জুতো পরে কত জায়গায় মানুষ হাঁটে, কতরকম জার্মস, ব্যাকটিরিয়া, লোকের কফ থুতু থাকে রাস্তায়। ওকে জীভ দিয়ে চেটে এই জুতো পরিষ্কার করতে হবে? কিছু হবে না তো? মুহূর্তের মধ্যে রুদ্র মৃদু হুংকার দিয়ে উঠলো, “কী হলো ‘স্লেভ’? এই তোর দৌড়?”
অয়ন ভয় পেল, এই বুঝি সব শেষ হয়ে যায়! নিজের যাবতীয় চিন্তা সরিয়ে দিলো জোর করে, বুঝলো এটা একটা আলাদা দুনিয়া, এখানে ওর এসব ভাবনা আঁকড়ে ধরে থাকলে আর কিছুই এগোবে না।
সে বলে উঠলো, “না না, রুদ্র দা। আমি তোমার স্লেভ হতে চাই। প্লিজ আমাকে সুযোগ দাও।”
বলেই অসম্ভব গা ঘিনঘিন ভাব নিয়ে ও মুখ নীচে নামালো, আস্তে করে ঠোঁট ঘসলো রুদ্রর জুতোয়, তারপর একরাশ ঘেন্না কে ইগনোর করে জীভ বার করে চাটতে শুরু করলো জুতোটা। নিজের ঘেন্না ভুলতে চোখ বন্ধ করে রুদ্র’র ইন্সটার সেই লেগ ডে এর ছবি চিন্তা করতে থাকলো। বেশ কিছুক্ষণ চললো এই জুতো চাটা।
“হয়েছে। ওঠ।” রুদ্রর কথায় চমকে উঠে মাথা তুললো অয়ন, তখনও সে হাঁটু গেড়ে, মেঝেতেই।
রুদ্রঃ বুঝলাম তুই সাবমিসিভ। কথা শুনেছিস তুই আমার। এবার দেখতে চাই তোর ইগো সত্যিই ছাড়তে পেরেছিস কিনা। দেখবো?
অয়ন মাথা একদিকে হেলিয়ে হ্যাঁ বললো। আর বলতেই ঠাস করে একটা চড় পড়লো অয়নের গালে। রুদ্র টেস্ট নিচ্ছে অয়নের রাগ হয় কিনা! অয়ন বুঝলো সেটা। চুপ করে থাকলো। তার গাল, কান গরম হয়ে গেছে।
থাপ্পড়টা খেয়ে একটু হেলে গিয়েছিল সে, একটু স্থির হয়ে বসতেই রুদ্র কঠোর ভাবে বললো, “গোন, কতগুলো হচ্ছে তুই গুনে আমাকে বলবি।”
বলেই এবার বৃষ্টি নামিয়ে দিলো, দু’হাত দিয়ে অয়নের দুই গালে পর পর প্রায় বারোটা চড় মারলো রুদ্র, নির্দয়ের মতো। রুদ্র হাঁপাচ্ছে একটু, অয়নের অবস্থা খারাপ, চোখ মুখ লাল, চোখের জল গাল বেয়ে নামছে।
“কটা হলো?”, রুদ্র।
“বারোটা”, ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে বললো অয়ন, মাথা নীচু।
অয়নের থুতনিতে হাত দিয়ে মুখটা তুললো রুদ্র, অয়ন ভাবলো এবার রুদ্রদা হয়তো একটু আদর করে দেবে ওকে। কিন্তু তা হলো না।
মুখটা তুলিয়ে অয়নের মুখের ওপর থুতু ফেললো রুদ্র, তারপর আবার হাত দিয়ে সেই থুতু অয়নের গোটা মুখে ক্রীম মাখার মতো মাখিয়ে দিলো। মাখানো শেষ হতেই দুই হাত দিয়ে আবার আগের মতো করে প্রায় ৬-৭টা চড় মারলো অয়নের গালে। এবারের গুলো ভয়ঙ্কর জোরে জোরে! এবার অয়ন অঝোরে কেঁদে ফেললো।
রুদ্র চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলো যতক্ষণ অয়নের কান্না থামে। মিনিট ছয়েক বাদে একটু থামলো অয়ন, আস্তে আস্তে ফোপাচ্ছে।
রুদ্র জিজ্ঞেস করলো, “এখনও কি চাস স্লেভ হতে? নাকি সেই ইচ্ছে বিদেয় হয়েছে?”
অয়নের জেদও তাকে ছাড়ছে না, থাপ্পড় খেয়ে খেয়েই আরো যেন বাড়লো। বলেই দিল, “আমি স্লেভ হবো, তোমার। আর কিচ্ছু জানি না আমি।”
এবার শোনা গেল রুদ্রর গলায় কঠিন কিন্তু শান্ত আদেশ, “এবার থেকে তাহলে শুধু সবার সামনে হলে ‘রুদ্র দা’ বলবি। একা আমার সামনে থাকলে ‘Sir’। তোকে আজ থেকে আমার স্লেভ বলে মানলাম। আমার পোষা মানুষ, আমার পোষা প্রাণী। যখন যা বলবো তুই চুপচাপ সেটা করবি কোনো প্রশ্ন না করে। মনে থাকবে? আর ফিরে যাবার কোনো পথ তোর জন্যে নেই।”
ঘোরের মধ্যে ছিল অয়ন। অয়ন মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললো, ওর মনে এখন একটা শান্তি। পেয়েছে ও, সেই জায়গাটা পেয়েছে রুদ্রদা’র কাছে।
কথাগুলো শেষ করেই রুদ্র হঠাৎ ঘুরে প্রচন্ড বেগে হাঁটা দিলো, সোজা ওই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পেছন পেছন গেল অয়ন, দেখলো করিডোর দিয়ে গিয়ে রুদ্র সিঁড়ি দিয়ে নামছে।
অয়ন পারলো না ধাওয়া করতে, এত সিনিয়র একজনকে এভাবে ক্যাম্পাসে ধাওয়া করলে সীন ক্রিয়েট হয়ে যাবে।
অয়ন তখন ব্যাগ থেকে একটা মাস্ক বের করে সেটা পরে বেরিয়েছিল সঙ্গীত ভবন থেকে। থাপ্পড় খেয়ে হয়তো গাল লাল হয়ে থাকবে।
সন্ধ্যে ৭টা। অয়নের সেই ইন্সটাতে মেসেজ, রুদ্র; লিখেছে, ১২/১ ফকির ঘোষ লেন, ৭০০৭৫, অমরাবতী এপার্টমেন্ট। ফোর্থ ফ্লোর , ফ্ল্যাট নম্বর ডি ওয়ান। কাল ইউনিভার্সিটি যাবি না। এখানে পৌঁছবি সকাল ১১টায়।
অয়নের এবারে পেটে প্রজাপতি, বুকে হাতুড়ি, আর মাথায় পোকা সব একসঙ্গে নড়তে শুরু করেছে। কী দেখছে সে! রুদ্র নিজে তাকে ডেকেছে? এটা নিশ্চয়ই রুদ্রদা’র ফ্ল্যাট, রুদ্রদা নিজে তাকে ডাকলো?? ওই ফ্যান্টাসিগুলো, ওই স্বপ্নগুলো সত্যিই সত্যি হবে??
পরের পর্ব শিগগির আসছে!